সাদা মানুষদের যুদ্ধ যা শেখাল

লেখক: সকাল বেলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মাস আগে

যুদ্ধের প্রথম শহীদ হয় সত্য; এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি যুদ্ধের ঝলকানিতে নাঙ্গা হয়ে পড়ে অনেক অন্ধকার।

‘যারা আমাদের মতো নয়’

ইউরোপের মানুষেরা যখন বাদামি বা কালো মানুষদের হত্যা করে, তাদের জমির দখল নেয়, তখন তার নাম হয় ‘সভ্যকরণ প্রকল্প’। সাদা মানুষেরা যখন আরবের মুসলিমদের হত্যা করে, তখন তা হয় সন্ত্রাস দমনের যুদ্ধ। আমেরিকা যখন ইরাক ও আফগানিস্তানে গণহত্যা চালায়, তখন তার নাম হয় ‘গণতন্ত্রায়ণ’। ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিন দখল করে রাখে, হামলা চালায় লেবাননে, হত্যা করে শিশুদের, তখন তা হয়ে যায় ‘আত্মরক্ষার অধিকার’।

এ রকম মিথ্যার বাগ্‌ধারায় বর্বরতাকে আড়াল করার নাম ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতি’। রাশিয়ার ইউক্রেন হামলাকে ইউরো-মার্কিন গণমাধ্যম যে সাহস নিয়ে আগ্রাসন বলতে পারছে, ইরাক-আফগানিস্তান-ফিলিস্তিনের বেলায় তারা তা বলতে পারেনি। কারণ, ইরাক আগ্রাসনকারী জর্জ বুশের ভাষায় ‘আমাদের জীবনধারা (আওয়ার ওয়ে অব লাইফ) তাদের মতো নয়। কারণ, তারা আমাদের মতো নয়। তারা আমাদের মতো খাদ্য খায় না, আমাদের মতো পোশাক পরে না এবং আমাদের ধর্মেরও তারা কেউ না।’

ইউক্রেনের শরণার্থীদের ছবি দেখে মার্কিন সিবিএস নিউজের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলে ফেললেন, ‘এটা ইরাক অথবা আফগানিস্তান নয়, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে, ইউক্রেন তাদের চেয়ে অনেক সভ্য, ইউরোপীয়।’ এটা বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়। বিবিসিতে কথা বলার সময় ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা বলছিলেন, ব্লন্ড চুল আর নীল চোখের ইউক্রেনীয়রা গাড়িতে করে পালাচ্ছে। এই বর্ণবাদী মন্তব্যের সঙ্গে সহমত জানিয়ে বিবিসির সাংবাদিক বললেন, ‘আমি আপনার আবেগ বুঝি ও সম্মান করি।’ ফরাসি টিভিতে আরেক সাংবাদিক বললেন, ‘আমরা সিরীয় শরণার্থীদের কথা বলছি না, আমরা বলছি, আমাদের মতো দেখতে ইউরোপীয়দের কথা।’ ব্রিটেনের টেলিগ্রাফে একজন লিখলেন, এটা দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর চলা যুদ্ধ না, ইউক্রেনীয়রা নেটফ্লিক্স দেখে, তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে।

ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। মানবতা সবার জন্য সমান নয়। দরিদ্র, অশ্বেতাঙ্গ, অখ্রিষ্টান, ইউরো-মার্কিন বলয়ের বাইরের মানুষের জীবনের মূল্য মধ্যবিত্ত, শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টান পাশ্চাত্যবাসীদের সমান না। তাই সিরীয় ও উত্তর আফ্রিকার শরণার্থীদের ঠেকানোর জন্য পূর্ব ইউরোপের সীমান্তে বিদ্যুতায়িত কাঁটাতারের বেড়া থাকবে, আর ইউক্রেনীয়দের জন্য থাকবে ‘খোলা দরজা’ ভালোবাসা! অথচ ইউরোপীয় কবি জন ডান বলেছিলেন, ইউরোপ কোনো দ্বীপ নয়, প্রত্যেক মানুষের মৃত্যুই মানবতার মৃত্যু। সিরীয় শিশু আইলান কুর্দি কিংবা ইয়েমেনে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে পতঙ্গের মতো মরে যাওয়া শিশুরা কি কখনো স্বর্ণকেশী নীল চক্ষু ইউরোপিয়ানদের সমান শোক পেতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ তামাম পশ্চিমা নেতারা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ভূখণ্ডে এত বড় মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটেনি। তাঁরা ভুলে গেছেন বসনিয়ার মুসলিমদের কথা। স্বাভাবিক। তাই তো বসনীয়রা তো ‘আমাদের মতো নয়!’

মানবতা সবার জন্য সমান নয়। দরিদ্র, অশ্বেতাঙ্গ, অখ্রিষ্টান, ইউরো-মার্কিন বলয়ের বাইরের মানুষের জীবনের মূল্য মধ্যবিত্ত, শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টান পাশ্চাত্যবাসীদের সমান না। তাই সিরীয় ও উত্তর আফ্রিকার শরণার্থীদের ঠেকানোর জন্য পূর্ব ইউরোপের সীমান্তে বিদ্যুতায়িত কাঁটাতারের বেড়া থাকবে, আর ইউক্রেনীয়দের জন্য থাকবে ‘খোলা দরজা’ ভালোবাসা!

আটলান্টিস্ট বনাম ইউরেশিয়ানিস্টদের যুদ্ধ

এমনকি রাশিয়াও তাদের চোখে ষোলো আনা ইউরোপ নয়। তাদের চার্চ আলাদা, তাদের জীবনধারা আলাদা এবং তারা অগণতান্ত্রিক। অতএব রাশিয়াকে ঘিরে ন্যাটোর সামরিকায়ন চলবে কিন্তু রাশিয়া হাত-পা নাড়াতেও পারবে না। কারণ, তারা আমাদের মতো নয়।

আমাদের অবশ্যই দ্বিধাহীন চিত্তে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরোধিতা করা উচিত। যেভাবেই হোক এই যুদ্ধ থামাতেই হবে। মানুষের হৃদয় তো টেলিভিশনের পর্দা নয় যে, এই বিপর্যয় ও উদ্বাস্তু দশা দেখেও কেঁপে উঠবে না? কিন্তু তারপর? ওয়ার অন টেরর, বোমারু বিমান দিয়ে গণতন্ত্র রপ্তানি, ইরান ও ভেনেজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চলতে থাকবে? চলতে থাকবে সামরিক ফ্রন্টে ন্যাটো আর অর্থনৈতিক ফ্রন্টে ডলারের একাধিপত্য? ভ্লাদিমির পুতিনকে অবশ্যই ইউক্রেন থেকে হাত গোটাতে হবে। কিন্তু পশ্চিমাদের আগ্রাসী অর্থনীতি ও যুদ্ধনীতিও বদলাতে হবে। ভাবুন তো ইরাক যুদ্ধের সময় দুনিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে বয়কট করছে, বিবিসি-সিএনএন নিষিদ্ধ করছে, ডলারে লেনদেন বাতিল করছে, রাশিয়াকে যেমন করেছে এবার, তেমন করে সাড়ে পাঁচ হাজার নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে!

মানবতা কেবল সাবেক দাস ব্যবসায়ী ও উপনিবেশের মালিকদের বর্তমান উত্তরাধিকারীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে আর বাকিরা পাবে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষের আসন? এ রকম বিশ্বব্যবস্থাই আধুনিক সব যুদ্ধের গোড়ার কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিকে অন্যায় চুক্তিতে আটকে না ফেললে হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটত না। অসলো চুক্তির বরখেলাপ না করলে গাজায় হামাসের জন্ম হতো না। এক চোখে ঠুলি পরে শান্তিবাদী হওয়া যায় না।

নতুন কোনো ইসরায়েল নয়

স্নায়ুযুদ্ধ দিয়ে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজিত, ওয়ারশ জোট বিলুপ্ত, তারপরও ন্যাটো কেন? কারণ, রাশিয়া আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে। কারণ, চীন হুমকি হয়ে উঠেছে। তার জন্য দক্ষিণ চীন সাগরে তাইওয়ান আর পূর্ব ইউরোপে ইউক্রেনকে ‘ইসরায়েল’ ধরনের রাষ্ট্র বানাতে চায় পাশ্চাত্য ব্লক। ইসরায়েল যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে পাহারা দিচ্ছে, ইউক্রেন সেভাবে পূর্ব ইউরোপ পাহারা দেবে এটাই তাদের চাওয়া। রাশিয়া যদি এই দফা ইউক্রেন আক্রমণ না-ও করত, তাহলেও কি রুশ সীমান্তে শান্তি আসত? ন্যাটোর পূর্বাভিযান বন্ধ হতো?

পৃথিবীর দুর্বল জাতিগুলোর হয়েছে উভয়সংকট। ইউক্রেনে ন্যাটোপন্থীদের বিজয় মানে আরেকটা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ফ্রন্ট চালু হয়ে যাওয়া। আবার পুতিনের জয় মানে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকিজনক উদাহরণ তৈরি হওয়া।

আলেকজান্ডার দুগিন ও বেল্ট অ্যান্ড ওয়ে

বহুকাল হলো দুনিয়া আটলান্টিস্টদের নিয়ন্ত্রণে। আটলান্টিক মহাসাগরের এ পারের উত্তর আমেরিকা এবং আরেক পারের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক ঐক্যকে ভূরাজনৈতিক পরিভাষায় আটলান্টিজম বলা হয়। এর বিপরীতে এসেছে রুশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার দুগিনের প্রচারিত ইউরোশিয়ান তত্ত্ব। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনসহ ক্রেমলিনের শীর্ষ ব্যক্তিদের এই তত্ত্বের সমর্থক বলে ধরা হয়। ইউরেশিয়ান তত্ত্ব বলে যে রাশিয়া ইউরোপ নয়, এশিয়াও নয়। রাশিয়া হলো ইউরোপ ও এশিয়ায় বিস্তৃত এক স্বতন্ত্র ইউরেশীয় সভ্যতা। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলই ইউরোশিয়া এবং চীন ও ইরান তার স্বাভাবিক মিত্র। এ অঞ্চলে আটলান্টিস্টদের রুখে দেওয়াই ভ্লাদিমির পুতিনের লক্ষ্য। অধ্যাপক আলেকজান্ডার দুগিন চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ নামের বৈশ্বিক প্রকল্পকে ইউরেশিয়া গঠনের মহাসড়ক বলে মনে করেন। আটলান্টিস্টদের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়া জোট হিসেবে আচরণ করছে। বিভিন্ন সময়ে ইরান ও তুরস্ককেও ইউরেশিয়ার কাছাকাছি আসতে দেখা গেছে। সুতরাং তত্ত্বটা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে টিকে গেছে।

সুতরাং ইউক্রেনে আমরা দেখছি, আটলান্টিস্ট বনাম ইউরেশীয় শক্তির প্রথম বড় সংঘাত। ভবিষ্যতে অন্যত্র তা ছড়াতে পারে। এদিকে দক্ষিণ চীন সাগরে ন্যাটো ধরনের কোনো সামরিকায়ন চীন মানবে না বলে হুঁশিয়ারি করেছে।

সুতরাং ইউক্রেনে পুতিন হারুন বা জিতুন, ক্ষমতায় টিকতে পারুন বা না পারুন, ওপরে বলা দুটি ভূরাজনৈতিক স্রোত থেমে থাকবে না। ইতিহাসের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ফিরে ফিরে আসবেই। আটলান্টিস্টদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেই। আজ রাশিয়া, কাল চীন, পরশু ব্রাজিল বা তুরস্ক নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করবে। রাজায় রাজায় চলা এসব যুদ্ধে ইউক্রেনের মতো দেশগুলোকে ‘উলুখাগড়া’ হতেই হবে। তাদের সবার চেহারা ও জীবনধারা আটলান্টিস্টদের মতো হবে না। দুটি ধারা দুই রকম মানবতার কথাই বলবে। কোনো যুদ্ধকে তারা সভ্যতাবাদী বলবে, কোনো যুদ্ধকে বলবে বর্বরতা। আটলান্টিস্টদের মানবতার তরিতে সবার ঠাঁই আগেও হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে সে ভরসা দেখি না।

নতুন স্নায়ুযুদ্ধের ভয়

পরাশক্তিগুলোর গিরি চাপে পড়ে আবারও দুনিয়া ভাগ হয়ে যাবে ‘আমরা’ আর ‘ওরা’ হিসেবে। সব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ডাক ইউক্রেনের মতো সাড়া পাবে না। এমনকি ইউক্রেনের স্বাধীনতা রক্ষার চেয়ে দেশটাকে রুশদের জন্য আরেকটা আফগানিস্তান বানানোতেই বেশি আগ্রহী আটলান্টিস্টরা। পুতিন চেয়েছেন, ইউক্রেনীয় ফ্রন্টে ন্যাটোকে বেকায়দায় ফেলে জাতীয় বীর হতে। বাইডেন চাইছেন ইউক্রেনীয়দের দুর্দশা দেখিয়ে দুনিয়াকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে আনা, ন্যাটোর সমরাস্ত্রের বাজার বাড়ানো, ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের লেজুড় করে রাখা এবং মার্কিন ডলার ও অস্ত্রের ব্যবসাকে আরও চাঙা করতে।

মানবতা কিংবা গণতন্ত্র হলো এসব স্বার্থের ঢাকনা, যার তলায় রয়েছে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের ঔপনিবেশিক বাসনা। পুতিন জিতলে ছোট রাষ্ট্রের ক্ষতি আছে বটে, ন্যাটো জিতলেও পস্তানির শেষ থাকবে না। তাই সাধু থাকতে চাইলে পা ফেলতে হবে সাবধানে, তাকাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। সেই ভবিষ্যতে সম্ভবত কোনো এক গোষ্ঠীর সর্বময় আধিপত্য থাকবে না। দুনিয়া মধ্যযুগের মতো বিভিন্ন কেন্দ্রে ভাগ হয়ে যাবে। আর ডলার তার চূড়ান্ত ক্ষমতা দেখিয়ে ফেলেছে। পারমাণবিক বোমার মতো সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কেবল একবারই ব্যবহার করা যায়। ডলার-নির্ভরতার বিপদ দুনিয়া দেখল। চীন বলছে, আমার কাছে বিকল্প মুদ্রা ও উপায় আছে। ইউরেশীয় ফ্রন্টে বিজয়ী হিসেবে চীনের বেরিয়ে আসা এবং ডলারকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবসানও এখন আর অনুমান নয়, সম্ভাব্য বাস্তবতা।

ছোট রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সাবধান হওয়ার আছে। কিউবা রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে স্বাধীন আছে। সিঙ্গাপুর টিকে আছে বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে। প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয়টা টেকসই। বিপদে যেন আমাদের এই বুদ্ধিটা বাড়ে।