পুতিন কি নিজের বিপদ ডেকে আনলেন

লেখক: সকাল বেলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মাস আগে

ইউক্রেনে রাশিয়ার অব্যাহত আগ্রাসন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে আগামী দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও বেশি বিপজ্জনক জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। এটি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই ঘটবে তা নয়, এই বিপদের আশঙ্কা রাশিয়ার ভেতরের সম্ভাব্য পরিস্থিতি এবং পুতিনের আচরণের মধ্যেও। এরপরও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের যে প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে, তা আরও বেশি বিস্তার লাভ করবে। এ কারণে ইউক্রেনের যুদ্ধ আগামী দিনগুলোয় আরও বেশি মাত্রায় ভয়াবহ রূপ নেবে। যে যেখানেই থাকি না কেন, এই যুদ্ধের উত্তাপ আমাদের গায়ে এসে লাগবে, ইতিমধ্যে তা লাগতেও শুরু করেছে।

রাশিয়া কি ইউক্রেনে কাদায় পড়েছে

যেকোনো ধরনের যুদ্ধে, যারা আগ্রাসন চালায়, তারা বিভিন্ন ধরনের হিসাব-নিকাশ করেই যুদ্ধের সূচনা করে। যুদ্ধের সম্ভাব্য পথরেখা কী হবে, সেটা ভাবা হয়ে থাকে। তাতে বিভিন্ন ধরনের দৃশ্যকল্প তৈরি করা হয়। এ ধরনের অনুশীলন যুদ্ধপ্রস্তুতির অংশ। এতে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয়ই বিবেচনা করা হয় না, বিবেচনা করা হয় এর প্রতিক্রিয়া কী হবে এবং সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। রাশিয়া অকস্মাৎ ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায়নি। এ যুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে। সে সময়েই ক্রিমিয়া ও ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সেনাসমাবেশ শুরু হয়, সীমান্তে রাশিয়ার সেনারা অনুশীলন চালিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল এ উপলক্ষে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আসা এবং পরে তা আগ্রাসনের সময় ব্যবহার করা। এ আগ্রাসন পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গত বছরের শেষ দিকে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, তাতে বলা হয়েছিল, রাশিয়া ২০২২ সালের শুরুর দিকে ১ লাখ ৭৫ হাজার সেনা নিয়ে ইউক্রেনে হামলা চালাতে পারে (ওয়াশিংটন পোস্ট–এর প্রতিবেদন, ডিসেম্বর ৩, ২০২১)। এ কারণে ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়ার আগ্রাসন অপরিকল্পিত বা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়।

 

কিন্তু যেটা বিস্ময়কর, তা হলো রাশিয়া যেসব হিসাব করে এ যুদ্ধের শুরু করেছিল, তার অনেকটাই মনে হচ্ছে ভুল হিসাব। খুব স্বল্প সময়ে রাশিয়া ইউক্রেন দখল করতে সক্ষম হবে—এমন ধারণা সঠিক হয়নি। দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরও রাজধানী কিয়েভ দখলে রাশিয়ার ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকেরা বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনী যে অগ্রসর হতে পারছে না, তার একটি কারণ হচ্ছে ইউক্রেনের আবহাওয়া। বলা হয়ে থাকে, ফল বা শরৎকালের শেষে রাশিয়া ও ইউক্রেনের আবহাওয়া এমন থাকে এবং কাঁচা রাস্তাঘাট এতটাই কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে যে সেখানে ট্যাংক বা সাঁজোয়া বহরের অগ্রসর হওয়া প্রায় অসম্ভব। কিয়েভ অভিমুখী সাঁজোয়া বহরের অনেক ছবি দেখে মনে হচ্ছে, রুশ বাহিনী কাদায় আটকে গেছে।

রাশিয়ার ভেতরে বিপদের শঙ্কা

২২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা পুতিন তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনকে বহাল রাখতে পেরেছিলেন যেসব কারণে, এর একটি অন্যতম দিক ছিল তিনি একধরনের স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। যেকোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা অর্থনীতি সফল বলে তাঁদের শাসনের বৈধতা দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু গত কয়েক দিনে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহভাবে প্রভাব ফেলেছে। রুবলের দাম এতটাই পড়ে গেছে যে তা আর কতটা কাজে দেবে, কেউ জানে না।

 

পুতিন ও তাঁর সহযোগীরা সম্ভবত এটা ভাবতে পারেননি যে কত দ্রুততার সঙ্গে পশ্চিমের এ নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। যদিও পুতিন এ যুদ্ধকে দেখাতে চাইবেন পশ্চিমের বিরুদ্ধে রাশিয়ার টিকে থাকার লড়াই, কিন্তু ক্রমাগতভাবে তা যে রুশদের জন্য অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে, এটি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশ থেকে বোঝা যায়। রাশিয়ায় মতপ্রকাশের ওপর আরও কঠোর ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এগুলোর কারণে দেশের ভেতরে যত অসন্তোষ বাড়বে, সরকার তত বেশি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নেবে। বলা আবশ্যক, পুতিনের এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন করার মতো রুশ নাগরিকেরা আছেন। কিন্তু যে ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এত দিন পুতিনের পাশে ছিল এবং এখনো আছে, তারা এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে কী ভূমিকা নেয়, সেটাও দেখার বিষয়। কেননা এ নিষেধাজ্ঞা তাদের লক্ষ্য করেই চাপানো হয়েছে। এসব ঘটনা পুতিনের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। যুদ্ধের দ্রুত নিষ্পত্তি করতে অভিযানের কৌশলকে আরও বেশি নিষ্ঠুর করে করে তুলতে পারেন।