ঠাকুরগাঁওয়ে রেলের টিকিট পেতে যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ

লেখক: মো: আল মোমিন, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ মাস আগে

ঠাকুরগাঁও রেল স্টেশনে রেলের টিকিট কালোবাজারিদের হাতে জনদুর্ভোগের অন্ত নেই। গত কিছুদিন যাবত ঠাকুরগাঁও রেলস্টেশনে রেলের টিকিট ক্রয় করার লাইনে দাঁড়ালে পাঁচ দশ মিনিটের মাথায় টিকিট শেষ এমন আওয়াজ আসে ভেতর থেকে পাশেই আবার লোকাল কিছু মানুষ অবৈধ ভাবে টিকিট বিক্রি করছে চড়া দামে, নার্যমূল্যের দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ দামে।

অনুসন্ধান করে জানতে পারা যায়, ঠাকুরগাঁও রেলওয়ে টিকিট কেনার জন্য অবৈধভাবে রাজনৈতিক, রেলওয়ে কর্মী ও স্থানীয় কিছু মানুষের মিলে একটি চক্র গড়ে তুলেছে। স্টেশনে অবস্থিত ভিক্ষুক ও ভবঘুরে ও টোকাই দিয়ে টিকিট ছাড়ার বহু পূর্বে চক্রের সদস্যদের লাইনে দাঁড় করিয়ে টিকিট কেনার টাকা দিয়ে দেয়। পরবর্তী টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে চারটি টিকিট সংগ্রহ করে এনে দিলে তিনশত টাকা কমিশন দেয়া হয় চক্রের পক্ষ থেকে। আবার টিকিট বিক্রিতে সহযোগিতা করলে টিকিট প্রতি ৫০ টাকা কমিশন দেয়া হয়। আধাঘন্টা থেকে এক ঘন্টা পরিশ্রম করে দুই থেকে তিনশ টাকা পেলে যে কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে যাবে টিকিট সংগ্রহের জন্য পরবর্তী টিকিট কাউন্টারে টিকিট না পাওয়া গেলে এরাই আবার কালোবাজারির কাছ থেকে চড়া দামে টিকিট ক্রয় করে দেয়। এতে সাধারণ মানুষ টিকিট ক্রয় করতে ব্যর্থ হয়ে উচ্চমূল্যে কালোবাজারি হাত থেকে টিকিট ক্রয় করে। এবং সিন্ডিকেট ওয়ালারা তাদের তৈরিকৃত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা অবৈধভাবে অর্জন করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন।

এ বিষয়ে স্থানীয় মানুষজন এর সাথে কথা বললে তারা জানান যে ঠাকুরগাঁও প্রতিদিন প্রায় যতগুলো টিকিট বিক্রি হয় প্রায় সিংহভাগ টিকিট কালোবাজারির হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি চক্রের মাধ্যমে। একজন কর্মী বানিয়ে মানুষজনের কাছে ব্ল্যাক টিকিট বিক্রি করে অবৈধভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা
বিভিন্ন সোর্স ভুক্তভোগী ও মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করে জানা যায় যে, স্টেশন মাস্টারসহ মিলিত একটি চক্র । এতে সাধারণ যাত্রীদের টিকিট পেতে পোহাতে হয় সীমাহীন ভোগান্তি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাউন্টারে মেলে না টিকিট। মেলে কাউন্টারের সামনেই কালোবাজারিদের কাছে। সকাল ৮টা থেকে কাউন্টার ও অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সার্ভার থেকে হাওয়া হয়ে যায় সব টিকিট।

যাত্রীদের অভিযোগ, কাউন্টারে গিয়ে ট্রেনের টিকিট না মিললেও বাড়তি টাকা দিয়ে স্টেশনের বাইরে টিকিট পাওয়া যায়। দ্বিগুণ বা তার বেশি দাম দিলে কাউন্টারের সামনেই কালোবাজারিদের হাতে পাওয়া যায় সব শ্রেণির টিকিট। এমনকি ঠাকুরগাঁওয়ের রেলের টিকিট মেলে স্টেশনের কিছু অসাধু কর্মচারী ও রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কিছু যুবকের হাতে। ঠাকুরগাঁও রোড স্টেশনকেন্দ্রিক একটি চক্র টিকিট কালোবাজারির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। এদের নিয়ন্ত্রণে ট্রেনের অধিকাংশ টিকিট। ফলে বাধ্য হয়েই যাত্রীদের স্টেশনের বাইরে থেকে বাড়তি টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হয়।

স্টেশনে টিকিট কিনতে আসা সাব্বির বলেন, কাউন্টারে গেলে টিকিট নেই বলে বিদায় করে দেওয়া হয়। পরে স্টেশনের কর্মচারী এক জনের সঙ্গে কথা বলে পাঁচটি টিকিট অতিরিক্ত দাম দিয়ে তার কাছ থেকে কিনি। আজমত রানা নামের স্থানীয় এক জন বলেন, ট্রেনের টিকিট না পাওয়ার প্রধান কারণ কালোবাজারিদের হাতে টিকিট চলে যাওয়া। মূলত দুইভাবে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারিদের হাতে যাচ্ছে। আমাদের প্রচলিত অনলাইনে টিকিট কাটার সিস্টেমে যে কেউ প্রতিদিন একই এনআইডি/ফোন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক টিকিট অনলাইন থেকে কিনতে পারে। এসব টিকিট পরে বেশি দামে বিক্রি করছে তারা। রাসেল নামে এক ব্যক্তি বলেন, কয়েক দিন আগে কাউন্টারে মাত্র ১৮টা টিকিট বিক্রির পর আমার পালা আসলে বলা হলো ‘টিকিট নেই’। আমি প্রতিবাদ করেছি, চিত্কার করেছি। আমার সঙ্গে আরো অনেকেই প্রতিবাদ করেছে, ফলে সেদিন কাউন্টার থেকেই আমাকে টিকিট দিতে বাধ্য হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের বুকিং সহকারী ফারুক হোসেন বলেন, আমি স্টেশনে মাত্র কয়েক মাস আগে এসেছি। ঠাকুরগাঁওয়ের বরাদ্দকৃত টিকিট দ্রুত শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কালোবাজারিদের হাতে সেখানে কীভাবে টিকিট মেলে তা আমার জানা নেই। এই বুকিং সহকারী আরো বলেন, প্রতিদিন সকালে স্টেশনে স্থানীয় অনেকেই এসে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট ক্রয় করেন। তাদের অনেকবার নিষেধ করা হলেও তারা মানেন না। তা ছাড়া স্টেশনের কর্মচারী ও সদস্যদের টিকিট কাটতেও নিষেধ করা হয়েছে। তারপরও তারা এসব কাজ করে থাকেন।

এ বিষয়ে জানতে ঠাকুরগাঁও রোড রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার আকতারুজ্জামান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমরা টিকিট বিক্রি করে থাকি। লাইন দিয়ে কে বা কারা আগে টিকিট কিনে নিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করে সেটা আমরা জানি না। তবে যেহেতু যাত্রীরা অভিযোগ তুলেছেন সে কারণে বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি।

স্থানীয় সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন সুধীমহলে এই সমস্যার প্রতিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান যে, স্টেশনের সিসি ক্যামেরা গুলো পর্যালোচনা করলে বুঝা যাবে কে বা কাহারা অবৈধভাবে টিকিট সংগ্রহ করে কালোবাজারি হাতে তুলে দিচ্ছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে এরকম ঘটনা আর ঘটবেনা আশা করা যায়।